স্বাস্থ্য খাতে ক‌মে‌ছে বরাদ্দ, বে‌ড়েছে চিকিৎসা ব্যয়

করোনা মহামারির কারণে গত দুই অর্থবছরের বা‌জে‌টে স্বাস্থ্য খাত বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছিল। য‌দিও গত বছর এই খাতে বরাদ্দ কমে যায়। এবারও সেই ধারা অব্যাহত র‌য়ে‌ছে। গত অর্থবছরের তুলনায় (১৫ হাজার ৮৫১ কো‌টি টাকা) এবারের বাজেটে প্রায় সা‌ড়ে তিন হাজার কোটি টাকা (১২ হাজার ২১০ কো‌টি টাকা) কম বরাদ্দ পাচ্ছে স্বাস্থ্যখা‌ত। যার ফ‌লে চিকিৎসায় ব্যয় বে‌ড়ে হ‌বে আকাশছোঁয়া।

চলতি অর্থবছরে দে‌শের সব‌চে‌য়ে বড় আকা‌রের বা‌জেট ঘোষণা হ‌য়ে‌ছে। যার প‌রিমাণ ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। বৃহস্পতিবার (০১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট পেশ করেন। 

স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য‌সেবা বিভাগ তা‌দের জন্য‌ ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ অর্থের সবটা ব্যবহার করতে না পারায় গুরুত্ব কম পে‌য়ে‌ছে এই খাত। ফলে মোট বাজেট বাড়লেও নতুন বাজেটে চাহিদামত অর্থ পাচ্ছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এ বিষ‌য়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই। বরাদ্দ কমানো হলে বেসরকারি চিকিৎসার প্রতি নির্ভরশীলতা তৈরি হবে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে না পেরে আরও সংকটে পড়বে দে‌শের কো‌টি কো‌টি দরিদ্র রোগীরা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ৩৫ হাজার ৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দ চাওয়া হয় সেই প্রস্তাবনায়। 

চলতি অর্থবছরের বরাদ্দের কত টাকা খরচ হয়েছে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট) নিলুফার নাজনীন জানান, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন কেনাকাটাসহ নানা কারণে প্রতিবছর কিছু অর্থ ফেরত যায়। য‌দিও এবার ফেরত যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ বেতন ও আউট সোর্সিংসহ হাসপাতালগুলোর চাহিদা অনুযায়ী বাকি অর্থ দেওয়া হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ও সেই অনুমোদন দিয়েছে। তবে চল‌তি অর্থবছ‌রে বরাদ্দের ম‌ধ্যে কত টাকা ব্যয় হয়েছে আগামী ১৪ জুনের পর ‌সেটা পুরোপুরি জানা যাবে।

প্রসঙ্গত, চল‌তি ২০২২-২৩ অর্থবছ‌রে স্বাস্থ্যখা‌তে বা‌জেট ছিল ১৫ হাজার ৮৫১ কো‌টি টাকা। যা ছিল মূল বা‌জে‌টের ৬ দশ‌মিক ৪ শতাংশ। অপর‌দি‌কে, আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছ‌রে স্বাস্থ্যখা‌তের প্রস্তা‌বিত বা‌জেট ধরা হ‌য়ে‌ছে ১২ হাজার ২১০ কো‌টি টাকা। যা মূল বা‌জে‌টের ৪ দশ‌মিক ৬ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) শেখ দাউদ আদনান জানান, চলতি অর্থবছরে জ্বালানি, কম্পিউটার এবং আসবাবপত্র কেনাকাটায় বরাদ্দ কমানো হয়েছে। 

তবে বরাদ্দ কমার প্রভাব স্বাস্থ্য খাতে নেতিবাচক হবে বলে জানান রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ। তিনি বলেন, টাকা থাকলে খরচ করার একটা উপায় থাকে। কিন্তু না থাকলে তা আর সম্ভব হয় না। এতে করে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় আরও ‌বে‌ড়ে যা‌বে। ইতোমধ্যে তা প্রায় ৭০ শতাংশ হয়েছে। এমন হলে বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানু‌ষের নির্ভরশীলতা আরও বাড়বে। 

বি‌শিষ্ট নিউ‌রোল‌জিস্ট আশরাফ আলী ব‌লেন, স্বাস্থ্যখা‌তে বরাদ্দ কমলে নি‌শ্চিত সংকট বাড়বে। বরাদ্দ কমার কার‌ণে রোগীদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ব‌লেও ম‌নে ক‌রেন এই চিকিৎসক। এতে করে রোগীরা ‌দে‌শের বাইরে চিকিৎসা নি‌তে যা‌বে। যার ফ‌লে চি‌কিৎসার খরচ বাড়বে। 

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ফরহাদ মনজুর বলেন, বরাদ্দ কমলে সেটা গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বিপদের কারণ হ‌বে। কারণ, রোগীরা তখন তার কাঙ্ক্ষিত চি‌কিৎসা‌সেবা পাবে না। এই ক্ষে‌ত্রে সমন্বয় ক‌রে, প্রয়োজ‌নে অন্য মন্ত্রণালয়গুলো থেকে নিয়ে সামাল দেওয়া যে‌তে পা‌রে।

এবা‌রের বা‌জে‌টে বরাদ্দ কমলেও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তার বিরূপ প্রভাব পড়বে না বলে ম‌নে করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অডিট) মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন। তিনি বলেন, বরাদ্দ যাই হোক, সেই টাকা ঠিকমতো ব্যয় করাটাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। তবে গবেষণায় থোক বরাদ্দ থাকবে কি না, সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্যে বাজেট কমলে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় আরও আকাশ ছোঁবে। কারণ, বাজেট যতটা দেওয়া হয় সেটাই ঠিকমতো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বার বার একটি অংশ ফেরত যাচ্ছে। মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য অনেক কিছুর সুষ্ঠু ও পরিকল্পনা কাঠামো দরকার। কিন্তু সেটি এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।

More Reading

Post navigation